শীতকালীন অবসাদ

শীতকালীন অবসাদ কখনো কি খেয়াল করেছেন যখন তাপমাত্রা কমে যায় এবং সকাল আরো অন্ধকার হয় তখন আপনার বিছানা থেকে উঠতে কত কষ্ট হয়? এমন হলে বিষয়টা আপনার একার অভিজ্ঞতা নয়। শীতের সময় অনেক মানুষই ক্লান্ত অনুভব করে এবং মন্থর হয়ে পড়েন।

শীতকালীন অবসাদ কি? শীতের সময় উষ্ণ, আরামদায়ক বিছানায় আরো দীর্ঘ সময় ধরে যদি আপনার থাকতে ইচ্ছে করে তবে এর জন্যে শীতের সকালের সূর্যের আলোক-স্বল্পতাকে দায়ী করতে পারেন। যেহেতু দিনগুলো ছোট হয়ে আসে, তাই এসময় আপনার ঘুম এবং জেগে থাকার নিয়মিত সময়সূচী ব্যাহত হয় যা আপনাকে ক্লান্ত করে তুলে। সূর্যের আলো কমে যাবার ফলে আপনার মস্তিষ্ক মেলাটোনিন নামক হরমোন অধিক পরিমাণে উৎপন্ন করে, যা আপনাকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে তোলে। কারণ এই ঘুম সংক্রান্ত হরমোন আলো এবং অন্ধকারের সাথে সম্পর্কিত, যখন সূর্য তাড়াতাড়ি অস্ত যায় তখন আপনার শরীরও চাইবে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে - এভাবে আপনি সন্ধ্যে হবার সাথে সাথেই ঘুম ঘুম ভাব অনুভব করতে পারেন।

শীতের সময়ে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়াটা আমাদের সবার জন্যেই একটি স্বাভাবিক বিষয়, কখনো কখনো এই ক্লান্তিভাব, শীতকালীন হতাশার উপসর্গ হতে পারে। স্বাস্থ্যের এই অবস্থা ঋতু দ্বারা প্রভাবিত স্বাস্থ্য সমস্যা (Seasonal Affective Disorder-SAD) নামেও পরিচিত, যা প্রতি ১৫ জনে একজনের হতে পারে, কিন্তু এর চিকিৎসাও আছে। আপনার এই ক্লান্তিভাব যদি গুরুতর হয় এবং বছরজুড়েই চলতে থাকে তবে আপনি হয়তো ক্রনিক ফ্যাটিগ সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।

শীতের সময় আপনার জীবনীশক্তি বাড়াতে এই কৌশলগুলো রপ্ত করতে পারেন-

আপনার ঘরের দরজা জানালা খুলে দিন যেন আপনার ঘরে অনেক সূর্যের আলো আসতে পারে। বাইরের প্রাকৃতিক আলোতে যান যত বেশী সম্ভব, এমনকি দুপুরে খাবার পর অল্প সময়ের জন্যে রোদের আলোয় হাঁটতে পারলেও উপকার হবে। আপনার কাজের ক্ষেত্র এবং বাসা উভয় স্থানেই যেন পর্যাপ্ত আলো-হাওয়া চলাচল করে তা নিশ্চিত করুন।

শীতের সময় সূর্যের আলো ধীরে ধীরে কমে যাওয়াতে ভিটামিন ডি পর্যাপ্ত পরিমানে নাও পাওয়া যেতে পারে এবং এটি আপনাকে দুর্বল করে দিতে পারে। ভিটামিন ডি এর প্রধান উৎস হল সূর্যের আলো। নারীদের জন্য বিশেষত যারা বোরকা পরেন, তাদের জন্য খুব সকালে ১০-১৫ মিনিটের জন্য সূর্যের আলোতে বসা এবং হাত ও পা সূর্যালোকে বের করে রাখাটা গুরুত্বপূর্ন। আপনি আপনার খাদ্য তালিকা থেকেও ভিটামিন ডি পেতে পারেন। ভিটামিন ডি’র ভাল উৎস হতে পারে তৈলাক্ত মাছ, ডিম এবং মাংস।

এমনকি স্বাস্থ্যসম্মত, সুষম খাদ্য গ্রহণের পরও দেহে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যারা ভিটামিন ডি এর ঘাটতি’র ঝুঁকি’র মধ্যে আছেন - ৬৫ বছর ও তার বেশী বয়স্ক সকলের -

-প্রতিদিন ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নেওয়া প্রয়োজন বলে পরামর্শ দেয়া হয়। -পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়ার উপায় সম্পর্কে আরো পড়ুন এখানে এবং জেনে নিন আপনার ভিটামিন ডি -সাপ্লিমেন্টের দরকার আছে কি না।

যখন শীত বাড়ে তখন শীতনিদ্রায় যাবার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়; কিন্তু এই ঘুম ঘুম ভাবের ফলে আপনার আরো বেশি করে উঠতে দেরি করা উচিৎ হবে না। আপনি এমনটি করলে বরং সারাদিন ধরে আলসেমী অনুভব করার সম্ভাবনা আরো বেড়ে যাবে। আমাদের শীতের সময় গরমের থেকে বেশী ঘুমানোর কোনো প্রয়োজন নাই। নিয়মিত আট ঘন্টা ঘুমানোর এবং একটি নির্ভরযোগ্য ঘুমের শিডিউল মেনে চলার চেষ্টা করুন। প্রতিদিন একই সময়ে বিছানায় যান এবং একই সময়ে ঘুম থেকে উঠুন। আপনার বেডরুম ঘুমের জন্য উপযুক্ত করে প্রস্তুত রাখুন - নোংরা থাকলে তা পরিষ্কার করুন, আরামদায়ক লেপ-কাঁথার ব্যাবস্থা রাখুন এবং টিভি বন্ধ করুন!

অন্ধকার শীতের সন্ধ্যেগুলোতে শারীরিক অনুশীলন করতে বরাবর-ই অনাগ্রহী থাকে লোকজন, কিন্তু আপনি যদি প্রতিদিন কিছু শারীরিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকেন তবে নিজেকে আরো শক্তিশালী অনুভব করবেন। সপ্তাহে ১৫০ মিনিটের অনুশীলন আপনাকে পর্যাপ্ত আদর্শ ব্যায়ামের কোটা পূরণ করতে সাহায্য করবে। পড়ন্ত বিকেলের অনুশীলন সন্ধ্যার অবসাদ থেকে আপনাকে মুক্তি দিতে পারে এবং এতে করে রাতের ঘুমেরও উন্নতি ঘটবে। শীতে নতুন ধরনের বা ভিন্ন কিছু কার্যক্রম নিয়ে চেষ্টা করে দেখার সেরা সময়। যদি আপনি আরো বেশী চনমনে হলে ফ্লাড লাইটের আলোয় ব্যাডমিন্টন অথবা ফুটবল কিংবা টেনিস খেলতে যেতে পারেন। যদি শীতের অন্ধকার মাসগুলোতে শারীরিক পরিশ্রমের জন্যে নিজেকে উজ্জীবিত করতে সমস্যা হয় তবে ইতিবাচক দিকটি ভাবুন - আপনি শুধু শক্তিশালী অনুভব করবেন না আপনার শীতের ওজন বৃদ্ধিও কমানো যাবে!

শীতের অল্প দৈর্ঘের দিনে সব কাজ শেষ করতে সময়-সল্পতার চাপ ওনুভব করছেন? এটা আপনার ক্লান্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। চাপ আমাদের অবসাদ বৃদ্ধি করে প্রমাণিত। চাপের জন্য কোন দ্রুত-সমাধান নেই কিন্তু কিছু সহজ টেকনিক আছে যার মাধ্যমে আপনি চাপ কমাতে পারেন। যদি কোন কারনে অতিরিক্ত চাপের মাঝে থাকেন, তবে ধ্যান, ইয়োগা, ব্যায়াম এবং শ্বাস- প্রশ্বাস অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে শান্ত ও চাপমুক্ত করুন।

গ্রীষ্মকাল শেষ হলে, সালাদ ছেড়ে দিয়ে স্টার্চ জাতীয় খাবার যেমন, খিচুরী, বিরানী, আলু এবং রুটি বেশী বেশী খেতে ইচ্ছে করবে। তবে আপনার আরো শক্তি হবে, যদি খাদ্যতালিকায় আপনি প্রচুর পরিমান ফলমূল এবং সবজি যোগ করেন। শীতকালীন সবজি যেমন গাজর, গাজরজাতীয় সবজি, শালগম ইত্যাদি ভর্তা করে অথবা স্যুপ করে খেলে আরো পরিবারের সবার জন্যই শক্তি তা উপাদেয় ও শক্তিদায়ক খাবার হতে পারে। শীতের সময়টাতে আপনি হয়ত মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি অনেক বেশি আকৃষ্ট হবেন, কিন্তু চিনি সমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলার করার চেষ্টা করুন – এটা আপনাকে দ্রুত অনেক শক্তি দেয়, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। চিনি জাতীয় খাবার কমানোর কিছু সহজ এবং দ্রুত উপায় সম্পর্কে জানুন এখানে।