কিভাবে ডায়েট করবেন

কিভাবে ডায়েট করবেন স্বল্প পরিমাণে শ্বেতসার গ্রহণ, দেহের বিষাক্ত পদার্থ কমানো, শুধু পানীয় পান ইত্যাদি নানান নতুন ডায়েট পরিকল্পনার মধ্য থেকে আপনি আপনার পছন্দসই উপায় বাছাই করতে পারেন, যা আপনাকে দ্রুত ওজন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। এই ডায়েট পরিকল্পনাগুলো কি কাজ করে?

এসব পরিকল্পনার অধিকাংশই আপনাকে দ্রুত এবং নাটকীয়ভাবে ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এরপর আপনার ওজন আবার দ্রুত বৃদ্ধিও পাবে। এইসব দ্রুত ওজন কমানোর পদ্ধতি গবেষণা নির্ভর নয় এবং এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ পদ্ধতি আপনাকে অসুস্থ্যও করে ফেলতে পারে।

ব্রিটিশ ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে এসব দ্রুত ওজন কমানোর পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে ওজন কমাতে আপনাকে সাহায্য করে না।

নিচে এসব দ্রুত ওজন কমানোর পদ্ধতির সমস্যাগুলো, স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কিত উপদেশ এবং কিভাবে স্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে ওজন কমানো যায় তা আলোচনা করা হল।

দ্রুত ওজন কমানোর ডায়েট থেকে বিরত থাকার পাঁচ কারণ:

ওজন কমানোর অনেক ডায়েট আপনাকে দ্রুত ওজন কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। অধিকাংশ সময়ই এই সব ডায়েট স্বল্প মেয়াদে ওজন কমানোর উপর জোর দেয় , ফলে খুব দ্রুতই আপনি আপনার হারানো ওজন আবার ফিরে পান। নিচে কেন এই ডায়েট পদ্ধতিগুলো থেকে বিরত থাকা উচিৎ তার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হল:

১. কিছু ডায়েট আপনাকে অসুস্থ্ করে ফেলতে পারে। এসব ডায়েট আপনি যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করেন তা কমানোর পরিকল্পনা করে থাকে; যার ফলে আপনি নাটকীয়ভাবে ওজন হারান। এসব ডায়েটের ফলে আপনি ভাল বোধ করবেন না এবং আপনি আগের ঠিকমত আপনার কাজকর্মও করতে পারবেন না, কারণ এসব ডায়েট পুষ্টিগতভাবে সুষম নয়। এসব ডায়েট দীর্ঘ মেয়াদে আপনার স্বাস্থ্যের অবস্থা নাজুক করে দিতে পারে।

২. খাবার বাদ দেওয়া ভয়ঙ্কর। মাংশ, মাছ, ময়দা বা দুধের তৈরি খাবার না খেলে আপনার দেহ সঠিকভাবে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি এবং ভিটামিন থেকে বঞ্চিত হয়। আপনি এসব খাবার বাদ না দিয়ে শুধু ক্যালরি গ্রহণ কমানোর মাধ্যমে আপনার ওজন কমাতে পারেন।

৩.স্বল্প শ্বেতসার যুক্ত খাবার উচ্চ ফ্যাটযুক্ত হতে পারে। কিছু ডায়েট আপনাকে শ্বেতসারযুক্ত খাবার যেমন পাস্তা, রুটি, ভাত ইত্যাদি পরিহার করতে বলে, কিন্তু এসব খাবার শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। স্বল্প-শ্বেতসারের ডায়েটের ফলে আপনার ওজন কমতে পারে, কিন্তু এসব খাবার প্রায়ই উচ্চ প্রোটিন ও ফ্যাট যুক্ত হয়, যা আপনাকে অসুস্থ্য করে ফেলতে পারে। স্বল্প-শ্বেতসারের খাবার খেয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট, মাথা ব্যাথা ও কোষ্টকাঠিন্যের মত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে। স্বল্প-শ্বেতসারের খাবার আপনাকে ক্ষুধার্থ করবে, ফলে আপনি বাটার, চিজ এবং মাংশের মত উচ্চ সম্পৃক্ত চর্বির খাবার পছন্দ করা শুরু করবেন। অধিকমাত্রার সম্পৃক্ত চর্বির খাবার আপনার কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, ফলশ্রুতিতে আপনার হৃৎপিন্ডের রোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

৪. নির্বিষ ডায়েট কাজ করে না। । দেহকে নির্বিষ করার অর্থ হচ্ছে কিছু বিশেষ ধরনের খাবার খাওয়া বা না খাওয়া যার ফলে আপনার দেহে বিষক্ত পদার্থ তৈরি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেহে যে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয় তা প্রমাণিত নয়; যদি তা হয়েও থাকে, তবে আমরা খুবই অসুস্থ্য অনুভব করব। ক্যালরির গ্রহণ কমানোর মাধ্যমে নির্বিষ ডায়েট স্বল্প মেয়াদে আমাদের ওজন হ্রাস করে। এসব ডায়েটে ময়দা ও দুধের মত দেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি সরবরাহকারী খাবার খাওয়া কমাতে বলে। অর্থাৎ, নির্বিষ ডায়েট স্বল্প মেয়াদে আপনার ওজন হ্রাস করলেও, তা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

৫. নানা ধরনের দ্রুত ওজন কমানোর ডায়েট প্রায়ই অস্বাভাবিক ধরনের হয়। এসব ডায়েটে কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ধরনের খাবার যেমন- নির্দিষ্ট স্যুপ বা কাঁচা খাবার খেয়ে, নয়তো এক বেলা খেয়ে থাকতে হয়। অন্যগুলো অস্বাভাবিক কিছু বিষয় দাবি করে, যেমন- রক্তের ধরনের উপর নির্ভর করে কিছু মানুষকে নির্দিষ্ট ধরনের খাবার খাওয়া কমাতে বলা হয়। কিছু ডায়েট, যেমন- ৫:২ ডায়েটে আপনাকে সপ্তাহে ৫ দিন খেতে এবং বাকি ২ দিন না খেয়ে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। ৫:২ ডায়েটের ভক্তরা দাবি করে যে এটি আপনাকে দীর্ঘদিন বাঁচতে সাহায্য করবে এবং আপনাকে নানা রোগ থেকে সুরক্ষা দিবে। প্রায়ই এসব দাবির পেছনে কোন প্রমাণ থাকে না। দীর্ঘকাল এরকম জীবনজাপন করাও বেশ কঠিন। আপনি যদি দীর্ঘ দিন এই ডায়েট অনুসরণ করেন, তবে তা অসম হওয়ার কারনে সেটি

আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এগুলো কম সময়ের মধ্যে আপনার ওজন কমতে পারে, তবে ধীরে ধীরে ওজন কমানোই অধিক ভাল এবং স্বাস্থ্যকর।

স্বাস্থ্যকর উপায়ে কিভাবে ওজন কমানো যায় আমাদের তখনই ওজন বাড়ে যখন আমরা আমাদের প্রতিদিনের কাজে এবং ব্যায়ামে ব্যবহৃত ক্যালরির চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করি। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই কম খাওয়া এবং বেশি কাজ করা উচিত। স্বাস্থ্যকর উপায়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে ওজন কমানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে স্থায়ীভাবে আপনার খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামে পরিবর্তন আনা। কিছু ছোট পরবর্তন যেমন কম খাওয়া এবং কম ফ্যাট, চিনি এবং অ্যালকোহল যুক্ত পানীয় পান করলে তা আপনাকে আপনার ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে। ব্যায়ামকে আপনার দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত করার আরো অসংখ্য উপায় আছে।

যদি আপনার ওজন বেশি হয় এবং আপনি আপনার ওজনের ৫ থেকে ১০% কমাতে চান তবে সপ্তাহে ০.৫ থেকে ১ কেজি (১ থেকে ২ পাউন্ড) ওজন কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করুন। আপনি যদি আপনার দৈনিক চাহিদার চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ ক্যালরি কম খান, তবে আপনার ওজন আপনার পরিকল্পিত মাত্রায় কমা উচিত। ওজন ঠিক রাখতে একজন গড়পড়তা পুরুষের দৈনিক ২,৫০০ ক্যালরি এবং একজন নারীর ২,০০০ ক্যালরি শক্তির প্রয়োজন হয়। দ্রুত ওজন কমানো নিরাপদ কিনা তা যাচাই করে নিন।

স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমানো শুরু করার ৬টি উপায় এখানে স্বাস্থ্যকরভাবে খাবার খাওয়া এবং ওজন কমানোর ৬টি সহজ উপায় বর্ণিত হল। আপনার খাবারে ফ্যাটের পরিমাণ কমানোর জন্য আপনি মাংশের বাড়তি চর্বি কেটে ফেলতে পারেন, ফুল ক্রিম দুধের পরিবর্তে সর পড়া বা অর্ধেক সর পড়া দুধ পান করতে পারেন, ননীর পরিবর্তে স্বল্প-ফ্যাটের দই ব্যবহার করতে পারেন। স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচন করুন। শস্য দ্বারা তৈরি খাবার খান, যেমন- হোলমিল রুটি, বাদামী চাল এবং পাস্তা। এগুলো অন্যান্য খাবারের চেয়ে ধীরে ধীরে হজম হয়, ফলে দীর্ঘ সময় ধরে আপনার পেট ভর্তি থাকে।

অবশ্যই সকালের নাস্তা করবেন। একটি স্বাস্থ্যকর সকালের নাস্তা আপনাকে দিন শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি যোগাবে। কিছু গবেষণায় দেখা যায়, যেসব মানুষ নিয়মিত সকালের নাস্তা খায় তারা সাধারণত বেশি ওজনের হন না। সারাদিন নানান ধরনের ফলমূল এবং শাকসসব্জির কমপক্ষে পাঁচ অংশ খাওয়ার চেষ্টা করুন।

যদি আপনার কোন নাস্তা খেতে ইচ্ছা করে, তবে প্রথমে একটি পানীয় পান করুন, যেমন- এক গ্লাস পানি বা এককাপ চা। প্রায়ই যখন আমরা নিজেদের ক্ষুদার্থ মনে করি, আসলে তখন আমরা তৃষ্ণার্থ থাকি। উচ্চ ক্যালরির পরিবর্তে স্বল্প-ক্যালরির পানীয় নির্বাচন করুন, অর্থাৎ যেসব পানীয়তে কম মাত্রায় ফ্যাট, চিনি এবং অ্যালকোহল থাকে সেগুলো পান করুন। চিনিযুক্ত কোমল পানীয়ের পরিবর্তে স্বচ্ছ ও এক টুকরো লেবুসহ পানীয় বাছাই করুন।

ব্যায়াম এবং ওজন কমানো নিয়মিত ব্যায়াম শুধু আপনার ওজনই কমাবে না, তা আপনার মারাত্মক রোগ হওয়ার ঝুঁকিও কমাতে পারে। আপনি কতটুকু ব্যায়াম করবেন তা আপনার বয়সের উপর নির্ভর করবে। ১৯ থেকে ৬৪ বছরের প্রাপ্তবয়স্কদের যারা ব্যায়াম শুরু করবেন, তাদের সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মধ্যম মাত্রার ব্যায়াম করার লক্ষ্য নিয়ে সেটি শুরু করা উচিত।