যক্ষ্মা

‘যক্ষ্মা’ নেই, কোন ‘রক্ষা’- সবাই তাই বলে, আপনিও কি শুনেছেন ? তাহলে চলুন জেনে নেই প্রবাদ টি কি সত্যি নাকি মিথ্যা? টিবি-টিউবারকিউলোসিস কি? টিবি যদিও একটি সংক্রামক ব্যধী, কিন্তু সহজে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই স্বল্প মাত্রায়। রোগটির পুরো নাম হচ্ছে টিউবারকিউলোসিস এবং লোকমুখে সংক্ষেপে বলা হয়ে থাকে টিবি। টিবি হচ্ছে একটি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন জা ‘মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিবারকিউলোসিস’ দ্বারা হয়ে থাকে। তবে অন্যতম একটি জীবানু হচ্ছে ‘মাইকোব্যাকটেরিয়াম বোভিস’ জা সাধারণত ক্ষুদ্রান্তকে আক্রান্ত করে থাকে। টিবি দ্বারা আক্রান্ত হলেও অনেকের ক্ষেত্রে এই রোগের লক্ষণসমূহ গুলো থাকে না।অর্থাৎ দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি যখন আক্রান্ত ব্যক্তির সকল লক্ষণসমূহ গুলো থাকে, টিবি রোগী। অন্যটি হচ্ছে টিবি জীবানু আপনার মধ্যে আছে তবে এর লক্ষ্যণসমূহ আপনার হয়তো বা নেই। শুধুমাত্র জীবানু আপনার শরীরে আস্তানা করে নিয়েছে, লেটেন্ট টিবি। সুখবরটি হচ্ছে এটি একটি চিকিৎসাপূর্ণ ও প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে নির্ণয় করা হলে চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসার গাফিলতির জন্য ও সঠিকসময় চিকিৎসা সম্পূর্ণ না করা হলে জীবান ঝুঁকিপুর্ণ হতে পারে।   টিবি কিভাবে  ছড়ায়? টিবি রোগটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাঁশি, কফ, থুতু অর্থাৎ  শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধমে জীবানু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।এই জীবানু বাতাস হতে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে যে কোন ব্যক্তির  ফুসফুসে আস্তানা খুঁজে নেয়। তবে তার মানে এই নয় যে,যে কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হবেন। সাধারনত আক্রান্ত হবার আশংকা তাদেরই থাকবে যাদের আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের সাথে যেমন যদি পরিবারের কেউ আক্রান্ত থাকে, বন্ধু-বান্ধব হতে, সহপাঠী, সহকর্মী হতে, স্কুল হতে, মেলামেশা বেশী হয়ে থাকে।   তবে এর থেকে যে  সকলেরই হবে তা নয়, তাই জেনে নিন যে নিম্নেলিখিত মাধ্যমে ছাড়াবে না। সহজে এই জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা খুবই কম। দীর্ঘদিন যদি আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সংস্পর্শে থাকা হয় সেক্ষেত্রে সংক্রামিত হবার আশঙ্কা ধীরে ধীরে বেড়ে যায়।     ব্যাকটেরিয়া শরীরে ভিতরে কিভাবে যাত্রা করছে? দূষিত বায়ু হতে জীবানু শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে শরীরের ফুসফুস অঙ্গে প্রথমে বাসা বেঁধে নেয়। রক্তের মাধ্যমে সেই জীবানু শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গ, কিডনী, মেরুদন্ড, মস্তিস্কে ছড়িয়ে পড়ে। ফুসফুসের ও শ্বাসনালীর টিবির জীবানু সগড়ি সংক্রামিত হয়। তবে অন্য অঙ্গ প্রতঙ্গের কিডনী, মেরুদন্ড, মস্তিস্কের জীবানু সক্রামনের প্রবনতা তুলনামূলক ভাবে খুবই কমআংশিক।     কাদের টিবি রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী? সাধারনভাবে যে কোন ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা টিবির ব্রাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করলেও, তা হতে প্রতিরোধ করে নিতে সক্ষম হয়। তাহলে এখন মনে প্রশ্ন আসছে যে কার হবে তাই না ? প্রশ্নের উত্তর টি হচ্ছে যখন সুস্থ্য মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কোন কারণে খুব কমে যায়, তখন আর টিবির জীবানুকে চিহ্নিত করে ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকে না।   যে সকল কারণে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আছে- ১। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি দূর্বল হয়- ২। দরিদ্রতা ও মাদক দ্রব্য ব্যবহার- ৩।আক্রান্ত পরিবারবর্গ বন্ধু বান্ধবদের সংস্পর্শে বেশী থাকা ও মেলামেশা করা ৪।কর্মস্থান-স্বাস্থ্যকর্মী বিশেষকরে ল্যাবে এই ব্যাকটেরিয়ার সাথে কর্মরত, বিভিন্ন মানুষের সংমিশ্রিত স্থানে বসবাস করা জেলখানা, টিকাদান সেন্টার, নার্সিং হোম।     কি কি লক্ষণসমূহ থাকবে? লক্ষ্যণসমূহ সাধারণত নির্ভর করে টিবির জীবানু শরীরের অভ্যন্তরে কোন অংশে বাসস্থান করে নিয়েছে এর উপর ভিত্তি করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই জীবানু ফুসফুস কেই বেছে নেয় ও খুব সহজেই শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শ্বাসযন্ত্র ফুসফুলে বাসস্থান করে নেয়। এর পর দেখা যায় যে দীর্ঘদিন এই আস্তানা হবার ফলে ক্রমান্বয়ে এর লক্ষ্যণসমূহ দেখা দিতে শুরু করে। কখনো কখনো শুধু জীবানুটি বছরের পর বছর বাসা বেঁধে থাকে কোন প্রকার লক্ষ্যনই দেখা যায় না।   যেসকল লক্ষ্যন ধীরে ধীরে বেড়ে গেলে আপনি বুঝবেন যে, আপনার টিভি হয়েছে? এ সকল কিছুর সাথে আরো কিছু সাধারণ লক্ষণ থাকে- ফুসফুস ছাড়া অন্যস্থানে যদি এর জীবানু আস্তানা খুঁজে নেয় সেক্ষেত্রে লক্ষ্যণসমূহ শরীরের অনুযায়ী ভিন্ন হবে। যেমন ধরুন - মেরুদন্ডের টিবির জন্য মেরুদন্ডে ও হাড়ে ব্যাথা, গলার লিম্ফনোড ফুলে জাওয়া।যদি লিম্ফনডে আক্রান্ত হয়,ক্ষুদ্রান্ত ও বৃহদান্তে আক্রান্ত হবার ফলে দীর্ঘদিন পাতলা পায়খানা, পেটে ব্যাথা, পায়খানার সাথে রক্তপ্রবাহ, পেটে পানি আসা, বমি, কিছুক্ষেত্রে পেটের যেকোন স্থানে চাকা অনুভব হতে পারে। কি মনে হচ্ছে? লক্ষ্যনসমূহ যদি পরে মনে হয় আপনার বা আপনার নিকটস্থ কারো টিবি হয়েছে সেক্ষেত্রে কি করবেন ? যেকোন সন্দেহ মানুষিক দিক থেকে অশান্তি সৃষ্টি করে।কাজেই যদি লক্ষ্যনসমূহ হতে বিন্দু মাত্র সন্দেহ থাকে সেক্ষেত্রে অবশ্যই নিকটস্থ হসপিটাল ও ডাক্তারের শরনাপন্ন হবেন। শারীরিক পর্যবেক্ষন ও পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে সুনিশ্চিত হতে। আমাদের দেশে সরকারী ও বেসরকারী  উভয় হসপিটালে যক্ষ্মা রোগ নির্নয়ের  ব্যবস্থাপনা আছে। আই.সি.ডি.ডি.আর.বি ( ICCR'B)সংস্থার বিভিন্ন সেন্টার আছে- এখানে স্বল্পখরচে টিবি নির্ণয় করা হয়।   কি কি পরীক্ষা করা হয় রোগটি নির্ণয়ের জন্য? ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া মাত্রই প্রথমেই তিনি আপনার লক্ষ্যনসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন ও জানবেন। এরপর স্টেথোস্কোপ দ্বারা বুকের শব্দ শোনার মাধ্যমে যদি ডাক্তারের কোন সন্দেহ থাকে সেক্ষেত্রে পরবর্তী কিছু শারীরিক পরীক্ষা করতে দেয়া হয়।   যে সকল শারীরিক পর্যবেক্ষন করা হয়ে থাকে কি কি চিকিৎসা সমূহ আছে আমাদের দেশে? সকল টিবি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষ্যণসমূহ থাকে না, যারা কেবল এই রোগে জীবানুর বাহক তাদেরকে বলা হয় লেটেন্ট টিবি।   লেটেন্ট টিভির রেজিমেন-
নাম সময়কাল কতদিন পর মন্তব্য
আইসোনিয়াজিড ৬ মাস দৈনিক/ সপ্তাহে দুইদিন
আইসোনিয়াজিড ৯ মাস দৈনিক/ সপ্তাহে দুইদিন দৈনিক প্রযোজ্য যাদের এইচ.আই.ভি আছে গর্ভবতী শিশু ২-১১ বছর পর্যন্ত গর্ভবর্তীদের জন্য
রিফাম্পিসিন ৪ মাস দৈনিক
যদি বাহক অবস্থায় সুচিকিৎসা সময়মতন গ্রহন না করা হয় সেক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ টিবিতে আক্রান্ত হয়ে জীবানুঝুকির সম্মুখিন হতে পারে।   আক্রান্তদের চিকিৎসা রেজিমেন- প্রথম ২ মাস পরবর্তী ৪ মাস পাইরিডক্সিন ২০ মি.গ্রা দৈনিক (ভিটামিন বি-৬) দৈনিক সকল ঔষুধের সাথে সেবন করতে দেয়া হয় সকালে নাস্তার আধাঘন্টা পূর্বে স্নায়ুর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রতিরোধ করার জন্য। এসকল ঔষধু শুরু ও সেবনের কিছুদিনের মধ্যেই আপনার নিজেকে সুস্থ্য মনে হবে তবে পরিপূর্ণ চিকিৎসা সম্পূর্ণ করা অত্যাবশ্যক।যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও পরবর্তীতে ভুগতভূগী হতে রক্ষা করতে ডট্স- রয়েছে। ডট্স হচ্ছে ডাইরেক্টলি অবসারভড  থেরাপী-এর মাধ্যমে সচক্ষে একজন স্বাস্থ্যকর্মী টিবির ঔসধ আপনাকে খেতে দেখবেন। মধ্যবর্তী অবস্থায় অথবা খুব শীঘ্রই ঔষুধ বন্ধ করা হলে পরবর্তী ঔষুধের বিপরীতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকারিতা আরো লোপ পায়, তাই সম্পুর্ণ চিকিৎসা যাতে সময়মতন গ্রহন করা হয় এর জন্য সরকার হতে এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সুনিশ্চিত করা হয়ে থাকে যে সকলেই সরকারী তরফ হতে ঔষুধ সমূহ পাচ্ছেন ও সময়মতন গ্রহন করছেন,এর মাধ্যমে সপ্তাহে তিন দিন একজন স্বাস্থ্যকর্মী সচক্ষে নিশ্চিত করবেন, টিবির ঔষধ সেবন করতে।   ঔষুধের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি? ঔসধুসমূহ খুবই হাইডোজের হয়ে থাকে, তাই এর দরুন পেটে ব্যাথা, বমিভাব, বমি, পাতলা পায়খানা, প্রসাবের রং কমলা, গায়ের বর্ণ হলদে - এসকল লক্ষ্যনসমূহ দেখা দিতে  পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই যদি দীর্ঘদিন লক্ষ্যণসমূহ থাকে সেক্ষেত্রে নিকটবর্তী চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীকে জানাবেন, তিনি সুপদক্ষেপ গ্রহন করবেন কিন্তু ঔষধু হঠাৎ করেই বন্ধ করে দিবেন না।   চিকিৎসা না গ্রহণে কি কি সমস্যা হতে পারে? সুসময়ে চিকিৎসা না গ্রহনে যেসকল ঝুঁকি আছে – ১.ফুসফুসের আবরনে ইনফেকশন হয়ে ফুসফুস ও আবরনের মাঝে ও ফুসফুসে পানি জমা হওয়া ২.মেরুদন্ডে ব্যাথা ৩.হাড্ডির জোড়াতে ব্যাথা-আথ্রাইটিস ৪.হৃদযন্ত্র বড় হয়ে আসা ৫.কিডনী ও যকৃৎ এর সমস্যা ৬.মস্তিস্কে আক্রান্ত করতে সক্ষম ৭.শ্বাসযন্ত্র অক্ষম হয়ে পড়া     আমি কি এর থেকে নিজেকে প্রতিরোধ করতে পারব? টিবি প্রতিরোধের জন্য টিকা আছে। এই টিকার নাম হচ্ছে বি.সি.জি। শিশুদের জন্য সরকারী তরফ হতে বিনামূল্যে দেয়া হয়ে থাকে। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য স্বল্প মূল্যে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে এই টিকাদান করা হয়ে থাকে।   এ ছাড়া নিম্নক্ত করনীয় এর মাধ্যমে প্রতিরোধ করা ও সম্ভব- ১.আক্রান্ত  অবস্থায় জনবহুল স্থানসমূহে স্কুল, কর্মস্থান, পারিবারিক ও বন্ধু সম্মেলনে অংশগ্রহন হতে বিরত থাকা।   ২.আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিবার সদস্য বা বন্ধুবান্ধবের সংস্পর্শে না ঘুমানো। ৩.ঘরের মধ্যে আলো-বাতাসের আসা যাওয়া নিশ্চিত করা।   ৪.মুখে রুমাল বা ঢেকে হাঁচি, কাঁশি দেয়া। ৫.ওরো নেসাল-মাস্ক পরিধান করা। ৬.যদি লেটেন্ট টিবি বাহক হয়ে থাকেন অথবা আক্রান্ত রোগী হন সেক্ষেত্রে  সম্পূর্ণ চিকিৎসা পরিপূর্ণ করা। আশা করছি উপরোক্ত তথ্যসমূহ মনোযোগ সহকারে পড়েছেন এবং আপনার ও আপনার নিকটস্থকে এর থেকে সাহায্য করতে সক্ষম হবেন।   মায়া বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে মায়া এন্ড্রয়েড এপ ডাউনলোড করুন এখান থেকে: https://bit.ly/2VVSeZa