সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজর্ডার বা মৌসুমি বিষণ্ণতার উপর আলোকপাত

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজর্ডার (SAD) বা মৌসুমি বিষণ্ণতার উপর আলোকপাত সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজর্ডার বা মৌসুমি বিষণ্ণতা বাংলাদেশে খুবই বিরল। কেননা বাংলাদেশ উষ্ণ প্রধান দেশ, এখানে গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ, শীতকাল কোমল, বসন্তকাল সৌন্দর্যময় ও শরৎকাল বর্ণিল হয়ে থাকে। তবে প্রবাসে যেসব বাংলাদেশি বাস করছেন, পড়ালেখা করছেন, এবং যারা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, কানাডাতে বসবাসের জন্য গমনের চিন্তা করছেন, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে রুক্ষ, কঠিন শীতকাল থাকে, সেসব ব্যক্তিদের সিজনাল অ্যাফেক্টভ ডিজঅর্ডার সম্পর্কে অবগত থাকা উচিত।

যদি কোন ব্যক্তি গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশে বাস করে, তারা উক্ত দেশসমূহে দীর্ঘ সময় ধরে শীতকালের জন্য অভ্যস্থ থাকে না। ঐ শীতকালের দিনগুলোকে অশেষ অন্ধকার মনে হয় এবং তখন সূর্যের উষ্ণতা পাওয়া খুবই বিরল। মৌসুমি বিষন্নতার প্রধান কারন হিসেবে এই সূর্যের অনুপস্থিতিকে ধারণা করা হয়। এবং সেই কারনে এই বিষন্নতার প্রাদুর্ভাব শরৎ ও শীতকালে বেশী পরিলক্ষিত হয়।

যখন আপনি দেখেন গাছের বর্ণ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং পাতা ঝরে যাচ্ছে… তখন আপনার কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। আপনি যখন বিকালের ব্যায়াম শেষে অন্ধকারের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরতে থাকেন, তখন গাড়ি থামিয়ে আপনার কাঁদতে ইচ্ছা করবে। আপনার স্বামী কাছে আসছে কি না সে বিষয়েও আপনার কোন আগ্রহ থাকবে না। যেকোন কিছুর প্রতি মনোযোগ দেওয়া দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে। কেউ আপনাকে কোন কিছু বললে (এমনকী আপনার আশেপাশে অন্য কাউকে বললেও), আপনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয় তিক্তভাবে তার জবাব দেওয়া।

এখনি নিশ্চিত হবেন না, তবে হতে পারে যে আপনি মৌসুমি বিষণ্ণতায় ভুগছেন। নির্দিষ্ট একটি ঋতুতে, বিশেষ করে শীতকালে এই স্বীকৃত মানসিক সমস্যা দেখা দেয় এবং এ সমস্যায় আক্রান্তদের ৬০-৯০ শতাংশই হয়ে থাকেন নারী।

আপনি কি আসলেই এসএডি-তে আক্রান্ত? এই প্রশ্নের উওর স্পষ্টভাবে দেওয়ার পূর্বে কোনটি এসএডি এবং কোনটি নয়, তা আপনাকে বুঝতে হবে।

এই রোগটি হয়ে থাকে এটি সত্য। সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজর্ডার একটি স্বীকৃত মানসিক রোগ বা অবস্থা, এ কথা পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়টি বার বার বলা দরকার এজন্য যে অনেকে বলতে থাকেন এসএডি একটি ‘প্রহসন’ বা ‘সবারই মন খারাপ হয়’। এটি সম্পূর্ণভাবে অসত্য এবং যখন এই ঋতুভিত্তিক বিষন্নতা ভর করে তখন এসএডি-তে আক্রান্তরা সাধারণ জীবনযাপন করতে ভীষণ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হোন।

এটি নিয়মিতভাবে হওয়া বিষণ্ণতা নয়। সারা বছর ব্যাপী বিষণ্ণতা অনুভব করলে এবং শীতকালে এ অনুভুতি তীব্র হলেই বলা যায় না যে আপনি এসএডি-তে আক্রান্ত। এসএডি নির্ণয়ের জন্য যেকোন একটি বিশেষ ঋতুর সাথে আপনার বিষণ্ণতা অনুভুতির স্পষ্ট যোগাযোগ থাকতে হবে। উপরন্তু, এই বিষন্নতা এমনভাবে আপনার অনুভব করার কথা যা স্বাভাবিক মন খারাপের থেকেও তীব্র এবং সেই সাথে কমপক্ষে টানা ২ বছর এ রোগের লক্ষণসমূহ প্রকাশিত হয়েছে বলে প্রমাণ থাকতে হবে।

এ সমস্যাটি পরিবারগত করনেও হয়ে থাকে। যদি আপনার কোনো আত্মীয় মৌসুমি বিষনণ্ণতায় আক্রান্ত থাকেন, তাহলে আপনিও এ সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই সাথে, কারো এসএডি তে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় যদি উক্ত ব্যক্তির পরিবারের কোনো সদস্য মদ্যপানে আসক্ত কিংবা বিষণ্ণতা সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগে থাকেন।

এ সমস্যা শুধুমাত্র শীতকালে সীমাবদ্ধ থাকে না । এসএডি-তে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শুধুমাত্র বছরের একটি ঋতুতে বিষণ্ণতার লক্ষণ দেখা গেলেও এটা শুধু শীতকালেই হবে এমনটি নয়। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ বিষয়টি সত্য, তবে গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে এসএডি’র অন্য আরেকটি সংস্করণ রয়েছে যার প্রাদুর্ভাব গ্রীষ্মকালে দেখা যায় এবং এটির ফলে বিষণ্ণতার পরিবর্তে পাগলামি, ভয় বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ প্রকাশিত হয়।

আলোর অনুপস্থিতির সাথে এসএডি জড়িত থাকে । বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলোর অভাব বা অনুপস্থিতির কারণে সিজনাল অ্যাফেক্টভ ডিজঅর্ডার মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। অন্যভাবে বলা যায় যে, যখন পর্যাপ্ত পরিমাণ আলো পাওয়া যায় না, তখন কিছু কিছু ব্যক্তি বিষণ্ণতার পর্যায়ে চলে যান। ভিটামিন ডি নিম্ন পরিমাণে উপস্থিত থাকা এসএডি তে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়- এ তথ্যতে আলোর অনুপস্থিতির সাথে এসএডি’র জড়িত থাকা সম্পর্কে ধারণা করা যায় ।

শারীরিক চর্চা দ্বারা এ বিষণ্ণতা দূর করা যায় না। কেউ কেউ মনে করেন যে শীতকালে কেউ বিষণ্ণতায় ভুগলে তা দূর করার একমাত্র পন্থা হলো তাদেরকে বাইরে বের করা ও ব্যয়াম করানো। এ চিন্তা মূর্খতা বা বোকামি মনে হলেও এর পিছনে প্রকৃতপক্ষে কিছু কারণ রয়েছে। সিজনাল ডিপ্রেশন বা মৌসুমি বিষণ্ণতার একটি হালকা রূপ রয়েছে যা “উইন্টার ব্লু” নামে পরিচিত। যারা এ সমস্যায় আক্রান্ত হোন, তাদের ক্ষেত্রে ঘুম থেকে ভোরবেলা ওঠা ও শারীরিক চর্চা উপকার বয়ে আনে। তবে, দুঃখজনক হলেও এ পদ্ধতি এসএডি’র জন্য খাটে না ।

এসএডি নিরাময়ের জন্য আপনি কী করতে পারেন? যদি আপনি বা আপনার ঘনিষ্ঠ কেউ মৌসুমি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হোন, তাহলে তা নিয়ে বসে থাকা ও অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তবে, যেহেতু ব্যয়াম ও শরীর চর্চার অন্যান্য পদ্ধতি এ রোগ নিরাময়ের জন্য প্রযোজ্য নয়, সেক্ষেত্রে আপনি কী করতে পারেন? ৩টি পদ্ধতি রয়েছে যা মৌসুমি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনুসরণ করার মাধ্যমে উপকার পেয়েছেন ।

আলো থেরাপি গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ৮০% এ পদ্ধতিকে সাহায্যকারী হিসেবে মনে করেন। এ থেরাপিতে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম আলোর সংস্পর্শে থাকতে হয়। এ থেরাপি গ্রহণের ২-৪ দিনের মধ্যে ফলাফল পেয়েছেন বলে রোগীরা জানিয়েছেন। অপরপক্ষে, থেরাপিস্টের কাছে কাউন্সেলিং সেশনে যোগদানের মাধ্যমে লক্ষণ নিরাময়ের প্রমাণও পাওয়া যায়। এবং কিছু ব্যক্তি এ সমস্যার প্রধান কারণই দূর করে দেন, যা হচ্ছে উষ্ণ জলবায়ুর দেশে গমন যেখানে তাদরেকে অনাকাঙ্খিত ঋতু পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হবে না।

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডার সম্পর্কে আরো জানতে চান? এ বিষয়ের উপর ইয়েলোব্রিকের একটি চমৎকার তথ্যচিত্র (ইনফোগ্রাফিক) দেখুন।