রাগ নিয়ন্ত্রণ

রাগ নিয়ন্ত্রণ রাগ খুবই স্বাভাবিক একটি আবেগ এবং এটি স্বাস্থ্যকরও, তবে যতক্ষণ এর ওপর তোমার নিয়ন্ত্রণ আছে তক্ষণই এটা ভাল। যখনি দেখবে রাগ তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন তোমার নিজেকে এবং আশেপাশের মানুষদের নিরাপদে রাখার জন্য তোমাকে একটা কিছু করতে হবে।

রাগ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তোমার যা যা জানা প্রয়োজন তার সবই এখানে বলা আছে। তুমি কিভাবে বুঝতে পারবে তোমার রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা আছে কি না? থাকলে কি করতে হবে, আর কি করা যাবে না?

তোমার কি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হচ্ছে? যদি তোমার রাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়, তাহলে সবচেয়ে ভালো সাহায্য তুমি তখনি পাবে যখন সেটা স্বীকার করবে। তোমাকে এটা মেনে নিতে হবে যে তোমার রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং সেটাকে প্রতিহত করার উপায়ও তোমাকে নিজেকেই খুঁজতে হবে। তুমি নিচের প্রশ্নগুলো নিজেকে করে দেখতে পারো -

১। কেউ তোমার মতের বিরুদ্ধে গেলেই কি তোমার শান্ত থাকা কঠিন হয়ে পড়ে?

২। তোমার পরিবারের সদস্যরা কি তোমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলে, কিংবা তারা কি তোমার রাগ নিয়ে ভীত থাকে?

৩। প্রচণ্ড রাগের বশে কি তুমি জিনিসপত্র (যেমন, গ্লাস, টেবিল, চেয়ার, ছাইদানি ইত্যাদি) ভেঙ্গে ফেলো কিংবা দেয়ালে জোরে ঘুষি মারো বা কখনো মেরেছো?

৪। রাগের মাথায় তুমি কি কখনো কারো গায়ে হাত তুলেছো, চড় মেরেছো বা আঘাত করেছো?

৫। যদি তোমাকে কোনো কথার মাঝখানে থামিয়ে দেয়া হয় বা সমালোচনা করা হয়, তাহলে কি তুমি রেগে যাও?

৬। ধরা যাক, কেউ তোমাকে কিছু বললো বা এমন কিছু করলো যার কারণে তুমি অনেক কষ্ট পেলে কিন্তু সে সময় তাকে কিছু বললে না। পরে কি তুমি 'তাকে কি বলতে পারতে' বা ' তাকে তখন আসলে কি বলা উচিত ছিলো' সেটা ভেবে মনে মনে গজগজ করে সময় পার করো?

৭। কেউ যদি তোমার সাথে কোনো ভুল করে, তাহলে কি তুমি তাকে সহজে ক্ষমা করতে পারো না?

৮। যখন তোমার প্রচণ্ড রাগ হয়, কিংবা তুমি প্রচণ্ড হতাশ বা আহত বোধ করো তখলে কি রাগ প্রশমনের জন্য তোমার খাওয়া-দাওয়ার মাত্রা বেড়ে যায়, কিংবা তুমি কি অ্যালকোহল বা অন্য কোনো মাদক ব্যবহার করে নিজের রাগ কমাতে চাও?

৯। অনিয়ন্ত্রিত রাগের জন্য কি তোমার কাজের অসুবিধা হয়?

১০। তুমি কি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রেগে যাওয়ার জন্য আবার নিজের অপর প্রচণ্ড রাগ অনুভব করো?

যদি তোমার বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তরই 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে তোমার রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা আছে এবং এ ব্যাপারে তোমাকে এখনই কিছু করতে হবে।

কেন রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে? অনেক কম বয়সে রাগ নিয়ন্ত্রনহীনতার সমস্যা হলে সেখান থেকে অনেক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাও হতে পারে। আবেগের সাথে কিন্তু তোমার শরীরের সম্পর্ক ওতপ্রোত। রাগের কারণে তোমার শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন হয়, যা থেকে নিচের বিষয়গুলো ঘটতে পারে -

যেসব কিশোর-কিশোরীর রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা থাকে তাদের কিন্তু বন্ধু সংখ্যাও খুব কম থাকে। তাদের আচরণ অনেক নেতিবাচক হয়, এবং পরীক্ষাতেও তারা ভালো গ্রেড পায় না। তাদের এরকম রাগের কারণে তারা অন্যের যথেষ্ট মনোযোগ পায় ঠিকই, কিন্তু তারপরও তারা সবসময় একা বোধ করে এবং অখুশি থাকে।

যদি তুমি প্রচণ্ড রাগের কারণে আক্রমনাত্নক আচরণ করো, তাহলে দেখবে তোমার বন্ধুবান্ধব আর পরিবারের সদস্যরা তোমার কারণে বেশ ভীত থাকছে। তারা হয়তো তোমার সাথে খোলামেলাভাবে কথাও বলতে পারবে না, এবং ধীরে ধীরে হয়তো তাদের সাথে তোমার দূরত্ব তৈরি হবে। যদি রাগের মাথায় জিনিসপত্র ছোঁড়াছুঁড়ির অভ্যাস থাকে তোমার, তাহলে কারো বিপদ ঘটিয়ে ফেলার আগেই কারো সাহায্য নাও।

কিভাবে বুঝবে যে তোমার রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে? এবার একটু পেছনের কথা চিন্তা করো। এমন একটা ঘটনার কথা ভাবো, যেখানে তোমার প্রচণ্ড রাগ উঠেছিলো। তখন তোমার কেমন লেগেছিলো? কি এমন হয়েছিলো যে তোমার অত রাগ হয়েছিলো? রাগ হলে একেকজনের আচরণ একেকরকম হয়, কিন্তু কিছু বিষয়ে সাদৃশ্য থাকে, যেমন -

এভাবেই তোমার শরীর অনিয়ন্ত্রিত রাগের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

কিন্তু তুমি ভেবে দেখো, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতেই কিন্তু তোমার এমন রাগ হয় যে তুমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলো। তুমি যদি সেটা চিহ্নিত করতে পারো, তাহলে কিন্তু সেরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সেই ঘটনা তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করার আগেই তুমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসতে পারবে। তোমাকে এটা মনে রাখতে হবে যে তোমার চিন্তা, অবস্থা, আচরণ সবকিছুই পরস্পর সম্পর্কিত। তুমি যেটা চিন্তা করো, সেটা তোমার অনুভূতিকে প্রভাবিত করে, আবার সেই অনুভূতিই কিন্তু তোমার আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে। আবার উল্টোভাবে, তোমার আচরণের কারণেও কিন্তু তোমার চিন্তায় প্রভাব পড়তে পারে, আবার তা থেকে তোমার অনুভূতিও প্রভাবিত হতে পারে। যেহেতু, এগুলা সবই একটা আরেকটার সাথে সংযুক্ত, একটাতে পরিবর্তন আনলেই কিন্তু অন্যগুলোর মধ্যেও বড় পরিবর্তন আসবে - সেটা চিন্তাই হোক, অনুভূতিই হোক আর আচরণই হোক।

কিভাবে তুমি রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারো ? যখনি তোমার মনে হবে রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং শরীরের ভেতরে বিক্রিয়াগুলো শুরু হয়ে গেছে, তখন যা যা করতে পারো -

যদি তোমার দীর্ঘমেয়াদী সাহায্যের প্রয়োজন হয় অনেকেরই এটা মেনে নিতে সমস্যা হয় যে তাদের অনিয়ন্ত্রিত রাগের সমস্যা আছে এবং তারা ক্রমাগতই আরও ক্রোধাতুর ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে থাকে। তোমার যদি এরকম সমস্যা থাকে এবং সেটা যদি তুমি চিহ্নিত করতে পারো, এবং রাগের লক্ষণগুলোও যদি ধরে ফেলতে পারো, তাহলে কিন্তু তুমি নিজেই নিজেকে সাহায্য করতে পারো এবং কাউকে বলতেও পারো তোমাকে নির্দেশনা দেবার জন্য।

কিছু পরামর্শ, যা তোমার জন্য সহায়ক হতে পারে -

'সবসময়' (সবসময়ই তুমি এমন করো), ' কখনোই নয়' (কখনোই তুমি আমার কথা শোনো না) , ' উচিৎ/ উচিৎ নয়' (আমি যা চাই তোমার তাই করা উচিৎ/ আমার চোখের সামনেই তোমার থাকা উচিৎ নয়) , 'অবশ্যই/ অবশ্যই নয়' ( আমাকে অবশ্যই সময়মতো যেতে হবে/ আমি অবশ্যই সময়মত যেতে পারবো না) জাতীয় শব্দগুলো যত কম ব্যবহার করা যায় ততোই ভালো।

কিশোর বয়স খুব সহজ সময় নয়। তোমার পৃথিবীটা এখন বিস্তৃত হচ্ছে, আর তুমি নতুন জিনিস শিখছো। সেটা যে সবাই বুঝবেই তাও কিন্তু নয়। নিজেকে প্রকাশ করতে গিয়ে রাগ হওয়া ঠিক আছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারানো রাগ কখনোই ভালো নয়। অনিয়ন্ত্রিত রাগ আক্রমণাত্মক মনোভাবকে বাড়িয়ে দেয় এবং তখন কাছের ও প্রিয় মানুষদেরও আঘাত করার ঝুঁকি থাকে। তুমি ওপরের পরামর্শগুলো কাজে লাগাতে চেষ্টা করতে পারো এবং সর্বোপরি তোমার কৈশোরটাকে উপভোগ করো!